Sunday, June 23, 2013

জেনেটিক্সে পেটেন্ট-ভূত ও একটি গুরুত্বপূর্ণ রায়

আজকের জেনেটিক্সের এই জয়জয়কারের পিছনে একটা পাবলিকলি ফান্ডেড প্রজেক্টের বিশাল অবদান – “হিউম্যান জিনোম প্রজেক্ট” (Human Genome Project)। ৬ বিলিয়ন অক্ষরে লেখা আমাদের মানবদেহের ডিএনএ পড়ার কাজটি প্রথম করেছে এই প্রজেক্ট। ১৯৯০ সালে শুরু হয়ে ১৩ বছর ধরে চলা ৩ বিলিয়ন ডলারের এই প্রজেক্টই আজকের ডিএনএ-কেন্দ্রিক গবেষণার ভিত্তি গড়ে দেয় সকল তথ্য বিনামূল্যে উন্মুক্ত করে দিয়ে। মানবদেহের ডিএনএ সিকোয়েন্স যদি তখন উন্মুক্ত না হতো, তাহলে পাবলিক গবেষণা এভাবে বিস্তৃত হতে পারতো না, আমাদের ডিএনএ জিম্মি হয়ে পড়তো ব্যবসায়িক কোম্পানির কাছে, আজকে ও ভবিষ্যতে আমরা চিকিৎসাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এর সুফল ভোগ করতে পারতাম না। এই সুফল কি এমনি-এমনি এসেছে? কোম্পানিগুলো কি এই চেষ্টা করেনি ডিএনএ বাণিজ্যকে তাদের কব্জায় নিয়ে যেতে?

‘সেলেরা জিনোমিক্স’ (Celera Genomics) নামের এক প্রাইভেট কোম্পানি ‘হিউম্যান জিনোম প্রজেক্ট’-এর সাথে পাল্লা দিয়ে মানুষের জিনোম (মানুষের সম্পূর্ণ ডিএনএ সিকোয়েন্স) বের করার প্রজেক্ট হাতে নেয় ১৯৯৮ সালে। তাদের বাজেট ছিলো ৩০ কোটি ডলার – হিউম্যান জিনোম প্রজেক্টের ১০ ভাগের ১ ভাগ। সেলেরাকে এক্কেবারে শুরু থেকে শুরু করতে হয়নি, কারণ ততদিনে হিউম্যান জিনোম প্রজেক্ট যেসব কাজ করেছিলো সেগুলো উন্মুক্ত ছিলো সবার জন্য। তখনো মানুষের ডিএনএ পুরোটা পড়ার প্রযুক্তি বের হয়নি। সেলেরা জিনোমিক্স যদি এ কাজটুকু সবার আগে করতে পারে, তবে তারা হিউম্যান সিকোয়েন্স পেটেন্ট করে নিবে। এরপর যারাই এই সিকোয়েন্স ব্যবহার করুক না কেন, তাদেরকে টাকা দিতে হবে। চিকিৎসা, কৃষি, শিল্প, নিরাপত্তাসহ যেকোন ক্ষেত্রেই এই সিকোয়েন্সের ব্যাপক চাহিদার কথা চিন্তা করে এই কোম্পানি আদা জল খেয়ে লাগে। তারা ভাল এক প্রযুক্তি আবিষ্কারও করে (Whole Genome Shotgun Assembly), যা দিয়ে দ্রুত সিকোয়েন্সিং করা যায়। এদিকে সেলেরা যাতে এই প্রযুক্তি দিয়ে হিউম্যান জিনোম প্রজেক্টের আগে মানুষের জিনোম বের করতে না পারে, সেজন্য হিউম্যান জিনোম প্রজেক্ট তড়িঘড়ি করে ২০০০ সালের জুলাই মাসে তখন পর্যন্ত তাদের হাতে থাকা মানুষের জিনোমের খসড়া প্রকাশ করতে বাধ্য হয়। এর ফলে সেলেরা আর মানুষের জিনোমের পেটেন্ট দাবি করতে পারলো না। পরে অবশ্য সেলেরা তাদের জিনোম দান করেছিলো হিউম্যান জিনোম প্রজেক্টে। এ প্রজেক্ট মানব ডিএনএ’র প্রায় ৯৯ ভাগ জিনোম সন্তোষজনক শুদ্ধতার সাথে প্রকাশ করে ২০০৩ সালে। হিউম্যান জিনোম প্রজেক্ট যদি তখন সফল না হতো, এর প্রভাব কী হতো তা কল্পনা করাও কষ্টকর, মানবজাতির ইতিহাসই হয়তো আলাদা হতো।

জিনোম গবেষণায় এ ঘটনাই কিন্তু একমাত্র পেটেন্ট-ভূত নয়। জিনোম সিকোয়েন্সের, বিশেষ করে মানুষের জিনোমের বিশেষ বাণিজ্যিক গুরুত্ব আছে। কারণ এই সিকোয়েন্স আমাদের অনেক বৈশিষ্ট্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। জিন হল জিনোমের একটা অংশ। বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ রোগ (যেমন- ক্যান্সার) এর সাথে কিছু জিন সম্পর্কিত। এমনই দুইটা জিন হল – BRCA1 ও BRCA2। এই দুইটা জিন স্তন আর জরায়ু ক্যান্সারের সাথে সম্পর্কিত। BRCA নামই এসেছে BReast CAncer থেকে। ডিএনএ থেকে এই দুইটা জিন আলাদা করেছে মিরিয়াড জেনেটিক্স (Myriad Genetics) নামের এক কোম্পানি। আলাদা করার পর এই জিন দু’টিই পেটেন্ট করে নেয় তারা। এর মাধ্যমে স্তন ক্যান্সার পরীক্ষার পদ্ধতি বের করেছে তারা। মনে রাখতে হবে – বিশ্বে স্তন ক্যান্সারের হার অন্য সব ক্যান্সারের চেয়ে বেশি। ২০০৮ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, বিশ্বে প্রতি বছর ১.৪ মিলিয়ন মানুষ স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয় এবং প্রায় ৪.৫ লাখ মানুষ এ কারণে মারা যায়। বিপুল সংখ্যক মানুষ স্তন ক্যান্সারের পরীক্ষার জন্য তাই মিরিয়াড জেনেটিক্সের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। মিরিয়াডের এই একাধিপত্যের অনিবার্য প্রভাব হল – এ টেস্টের দাম মাত্রাতিরিক্ত বেশি হওয়া। ২০ হাজারেরও বেশি জিন-সমৃদ্ধ পুরো জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ে যেখানে খরচ পড়ে মাত্র ৪০০০ ডলার, সেখানে মাত্র কয়েকটা জিন সিকোয়েন্সিংয়ের জন্য দাম নেয় ৩০০০-৩৫০০ ডলার। শুধু তাই না, স্তন ক্যান্সারের এসব টেস্টের সকল ডাটা এখন মিরিয়াডের কাছে। মিরিয়াড যেখানে এসব ডাটার উপর ভিত্তি করে ঔষধ তৈরি করছে, অন্য কোন গবেষকের পক্ষে এ ডাটা নিয়ে কাজ করা সম্ভব না, এমনকি মিরিয়াডের অনুমতি ছাড়া এ জিন নিয়ে কাজ করাও সম্ভব না। একারণে ইউনিভার্সিটি অফ পেনসিলভানিয়ার জেনেটিক ডায়াগনস্টিক ল্যাবরেটরিকে মিরিয়াডের কাছ থেকে পেটেন্ট আইন লঙ্ঘন করার উকিল নোটিশও পেতে হয়েছে ১৯৯৮ সালে। এভাবে স্তন ও জরায়ু ক্যান্সারের জগতে তাই মিরিয়াডেরই আধিপত্য এবং মানুষজন এদের হাতে জিম্মি।

জিন আছে আমার দেহে। একটা কোম্পানি আমার ডিএনএ থেকে একটা বিশেষ জিন আলাদা করেছে। খেয়াল করে- তারা কিন্তু জিন তৈরি করেনি। আর এই কারণে আমি এবং আমরা সবাই তার উপর নির্ভরশীল হয়ে যাবো? এ সংক্রান্ত সকল গবেষণা তাদের হাতে জিম্মি হয়ে যাবে? এর উলটো একটা যুক্তিও আছে। কপিরাইট বা মেধাস্বত্ব আইন একজন মানুষকে তার প্রকৃত কাজের পূর্ণ অধিকার দেয়, সেই মানুষটা যেন তার কাজের স্বীকৃতি এবং সংশ্লিষ্ট অর্থোপার্জন করতে পারে সেই অধিকার সংরক্ষণ করে। সাংঘর্ষিক এ ব্যাপার তাই আদালত পর্যন্ত গড়ায়। অ্যাসোসিয়েশন অফ মলিকিউলার প্যাথোলজি এধরনের জিন পেটেন্ট নিষিদ্ধ করার জন্য আদালতের দারস্থ হয়। জিন পেটেন্টের পক্ষের লোকের দাবি – এই পেটেন্টগুলো বায়োটেকনোলজি সংক্রান্ত গবেষণায় বিনিয়োগকে উৎসাহিত করে। আর অন্য পক্ষের দাবি – এগুলো ক্যান্সারসহ বিভিন্ন গবেষণায় অন্যদের জন্য বাধা সৃষ্টির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট গবেষণাকে সীমিত করে দেয়, অথচ জিনে এবং জেনেটিক তথ্যাদি প্রকৃতির তৈরি, কোন কোম্পানির নয়। ২০১০ সালের মার্চে ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট এ ধরনের জিন পেটেন্টকে অবৈধ বলে ঘোষণা করে এই বলে যে,
‘আলাদা করা’ ডিএনএ অংশটুকু প্রকৃতিতে প্রাপ্ত ডিএনএ থেকে অভিন্ন, আর প্রকৃতিতে প্রাপ্ত কোন বস্তু পেটেন্টের আওতার বাইরে।

পরে মিরিয়াড এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে এবং এ রায়ের অংশবিশেষ তাদের পক্ষেও যায়। এ নিয়ে অনেকদিন ধরে আদালতের নানান পর্যায়ে শুনানি চলতে থাকে। সব শেষে গত ১৩ জুন ২০১৩ তারিখে আমেরিকার সুপ্রীম কোর্ট রায় দেয় –
প্রকৃতিতে প্রাপ্ত সকল ডিএনএ সেগমেন্ট প্রকৃতির অংশ, তাই কেবল প্রকৃতি থেকে আলাদা করেছে বলে সেই ডিএনএ সেগমেন্ট কেউ পেটেন্ট করার অধিকার রাখে না। তবে যেসব সেগমেন্ট প্রকৃতিতে সরাসরি পাওয়া যায় না (যেমন cDNA বা কমপ্লিমেন্টারি ডিএনএ) সেগুলো পেটেন্ট করা যেতে পারে।

রায়ে বিচারকগণ এটাও উল্লেখ করেন যে, মিরিয়াড ডিনএ’র অংশটুকু আলাদা করার প্রযুক্তিটুকু পেটেন্ট করতে পারতো, কিন্তু সেটুকুও মিরিয়াড নিজেরা আবিষ্কার করেনি, বরং সে প্রযুক্তি আগে থেকেই বহুল ব্যবহৃত।
প্রকৃতিতে প্রাপ্ত জিন পেটেন্টের আওতাভূক্ত নয় বলে দেয়া রায়কে স্বাগত জানায় সকল গবেষক, ডাক্তার ও সংশ্লিষ্টরা। একটা গ্রুপ অবশ্য এর বিরোধিতাও করে এই বলে যে, বায়োটেকনোলজিতে বিনিয়োগের পরিমাণ কমে যাবে। আমার মতামত অবশ্য এর উলটো – এটা বরং বায়োটেকনোলজিতে বিনিয়োগকে উৎসাহিত করবে। কারণ – একটা রোগ বা একটা বৈশিষ্ট্য কেবল একটা জিনের উপর নির্ভর করে না, বরং অনেকগুলো জিনের উপর নির্ভর করে। তাই একটা রোগের চিকিৎসা বের করতে গেলে বা একটা জেনেটিক বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন গেলে আগে আরো অনেক জিনের পেটেন্টের বাধার সম্মুখীন হতে হতো, এখন যার দরকার হবে না।

স্বাগত জানাই প্রাকৃতিক জিনোমকে পেটেন্টের আওতা বহির্ভূত করার এ রায়কে।

Friday, August 3, 2012

জীবনের গল্প (পর্ব-২)

জীবনের গল্পের শুরুর দিকের কাহিনী ভুলে গেছেন নিশ্চয়। সেটাই স্বাভাবিক, সমস্যা নাই, একটু মনে করিয়ে দিচ্ছি। মানুষসহ যেকোন জীবের জীবনের রহস্য লুকিয়ে আছে কোষের মাঝে, যা আবিষ্কার করেছিলেন রবার্ট ব্রাউন সেই ১৬৬৫ খ্রিস্টাব্দে। এর ২০০ বছর পর গ্রেগর জোহান মেন্ডেল নামের এক ধর্মযাজক ১৮৬৫ সালে মটরশুটি চাষের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো বিজ্ঞানসম্মত পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে তত্ত্ব প্রদান করেন যে, প্রজাতির বংশানুক্রমিক বৈশিষ্ট্যের জন্য ‘জীন’ দায়ী। প্রতিটা বৈশিষ্ট্যের জন্য এই জীনের ২টা অংশ থাকে - একটা অংশ আসে মায়ের কাছ থেকে, আরেকটা বাবার কাছ থেকে। এখানে মনে রাখা প্রয়োজন যে, মেন্ডেল কিন্তু স্বচক্ষে জীন দেখেননি, বরং যা বংশগতির বৈশিষ্ট্য ধারণ করে তারই নাম দিয়েছিলেন জীন। এরও প্রায় ৫০ বছর পর বিজ্ঞানী মরগ্যান বের করলেন যে, জীন অর্থাৎ বংশগতির ধারক থাকে কোষের নিউক্লিয়াসের মধ্যে থাকা ক্রোমোজোমের ভিতরে। মা ও বাবার ক্রোমোজোমের মধ্যে ক্রস-ওভারের ফলে সন্তান-সন্ততিরা মিশ্র বৈশিষ্ট্য পেয়ে থাকে।

জীনের কাজ কি তা বের হলো যেভাবে


যে কথা বলছিলাম, ১৯৪০ সালের শুরুর দিকেও বিজ্ঞানীরা জানতেন না জীন কী দিয়ে তৈরি, এর কাজই বা কি। একে একে নানান মজার মজার ছোট ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার মাধ্যমে জেনেছেন তারা। এমনই এক মজার পরীক্ষার মাধ্যমে বিডল আর ট্যাটম জীনের কাজ কি তা বের করেছেন ১৯৪১ সালে। তাদের পরীক্ষা Neurospora নামের রুটির ছত্রাক নিয়ে। এই ছত্রাক কেবল চিনি (সুক্রোজ) আর লবণ পেলেই বেঁচে থাকতে ও বংশ বৃদ্ধি করতে পারে। এই দুই বিজ্ঞানী করলেন কি, ছত্রাকের উপর এক্স-রে ফেললেন। তাতে হলো কি, ছত্রাকের বংশবৃদ্ধি থেমে গেল। এতে তারা সিদ্ধান্তে পৌঁছালেন যে, এক্স-রে নিশ্চয় এমন কোন জীন মেরে ফেলেছে যা বংশবৃদ্ধিতে সহায়তা করে। এখানেই তারা থামলেন না। তারা জানতেন যে, চিনি আর লবণ থেকে অ্যামিনো এসিডসহ জীবের পুষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র তৈরি করার জন্য যে ধরনের রাসায়নিক বিক্রিয়া প্রয়োজন, তা করা যায় প্রোটিন বা এনজাইমের সাহায্যে। তাই তারা বংশবৃদ্ধি বন্ধ হওয়া ছত্রাককে ভিটামিন বি-৬ খাওয়ালেন। আশ্চর্যের সাথে লক্ষ করলেন যে, ছত্রাকগুলো কেবল পুনরায় বংশবৃদ্ধি শুরু করেনি, বৃদ্ধির হারও অনেক বেড়েছে। এর সবচেয়ে সহজ ব্যাখ্যা ছিল এমন - এক্স-রে নিশ্চয় এমন কোন জীন মেরে ফেলেছে যা ভিটামিন বি-৬ সংশ্লেষণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিন তৈরি করত। সব মিলিয়ে মানে দাঁড়াল, জীনের কাজ হচ্ছে প্রোটিন তৈরি করা! এত সহজ আর মজার পরীক্ষার মাধ্যমে তারা আবিষ্কার করে ফেললেন জীবনের অন্যতম এক সত্য। এ কাজের জন্য তারা ১৯৫৮ সালে নোবেল প্রাইজও পেয়ে গেলেন।


উপেক্ষিত ডিএনএ'র জীন-গবেষণায় অন্তর্ভূক্তি


আজকাল বিজ্ঞান সম্বন্ধে সামান্য ধারণা আছে, কিন্তু ডিএনএ'র নাম শোনেনি এমন লোক পাওয়া বোধ হয় দুষ্কর। বেশিরভাগই হয়তো এ সম্বন্ধে বিশেষ কিছু জানে না, তবে "ডিএনএ টেস্ট করলেই সব জানা যাবে!" এ ধরনের জ্ঞানগর্ভ উক্তিদাতার খুব একটা অভাব দেখা যায় না! এই ডিএনএ ১৮৬৯ সালে আবিষ্কৃত হলেও জীন গবেষণায় উপেক্ষিত ছিল প্রায় ৭৫ বছর। কেন এই উপেক্ষা? দাঁড়ান, বলছি। শ্বেত রক্তকণিকার নিউক্লিয়াস থেকে ফ্রেডরিক মিশার এক ধরনের বস্তু আলাদা করেছিলেন, যার নাম দিয়েছিলেন নিউক্লিন। পরবর্তীতে এর নাম হয় ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক এসিড বা সংক্ষেপে ডিএনএ। বিংশ শতকের শুরুর দিকে বিজ্ঞানীরা জানলেন যে, ডিএনএ আসলে একটা অনেক বড়সড় অণু, যা তৈরি চিনি, ফসফেট এবং অ্যাডেনিন (সংক্ষেপে A), থাইমিন (T), গুয়ানিন (G) আর সাইটোসিন (C) নামক চার ধরনের ক্ষার দিয়ে। A,T,G,C এই চার ধরনের ক্ষারের ভিন্ন ধরনের সন্নিবেশের কারণেই একেকটা ডিএনএর স্বাতন্ত্র। বিজ্ঞানীরা একটু ভুল করলেন এই সন্নিবেশ ধরতে। তারা শুরুতে অন্যান্য পলিমার অণুর মতো বিবেচনা করলেন, যেখানে একই প্যাটার্নের পুনরাবৃত্তি ঘটে। যেমন ACTGAACTGAACTGA - তে ACTGA প্যাটার্নটি আছে ৩ বার। একই প্যাটার্নের অতি সাধারণ পুনরাবৃত্তিসম্পন্ন ডিএনএ এত বৈচিত্রময় জীবনবৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করতে পারে না - এই ভেবে বিজ্ঞানীরা নজরই দিলেন না এই মহাগুরুত্বপূর্ণ অণুটির উপর। অবস্থার পরিবর্তন ঘটলো ১৯৪৪ সালে অসওয়াল্ড অ্যাভেরি এবং তার দুই সহকর্মী ম্যাকলিউড আর ম্যাককার্টি প্রমাণ করলেন যে, ডিএনএর ভিতরেই জীনের অবস্থান!

অ্যাভেরিদের পরীক্ষাটাও মজার। তারা ব্যাক্টেরিয়া থেকে বিভিন্ন জৈব পদার্থ সরিয়ে ফেলার কৌশল ব্যবহার করলেন তাদের পরীক্ষায়। Streptococcus pneumoniae নামের এক ধরনের ব্যাক্টেরিয়া আছে। নামের ২য় অংশ দেখেই আশা করছি বুঝতে পারছেন যে, এটি নিউমোনিয়ার অন্যতম কারণ। এই ব্যাক্টেরিয়ার ২টা রূপ আছে - মসৃণ আর অমসৃণ, নিচের ছবির মতো।

চিত্র ১: মসৃণ ও অমসৃণ S. pneumoniae কোষ
Dr. Harriet Ephrussi-Taylor এর গবেষণার ছবি, সৌজন্যে: The Rockefeller University
 অমসৃণ থেকে মসৃণ রূপে রূপান্তর হলেই রোগ দেখা দেয়। অ্যাভেরিদের আগে বিজ্ঞানীরা ধারণা করতেন যে, জীন আছে প্রোটিনের ভিতর। তাই তারা শুরুতে এই ব্যাক্টেরিয়া থেকে প্রোটিয়েজ ব্যবহার করে সকল প্রোটিন ধ্বংস করে ফেললেন। কিন্তু তাতে রোগ সারলো না, অর্থাৎ অমসৃণ থেকে মসৃণ রূপে রূপান্তর চলতেই থাকলো। তার মানে, অমসৃণ থেকে মসৃণে রূপান্তরের জন্য যে তথ্য দরকার, তা প্রোটিনের ভিতরে থাকে না, থাকলে তো প্রোটিন ধ্বংসের সাথে সাথে এই রূপান্তর বন্ধ হয়ে যেত। এরপর তারা ডিএনএ ধ্বংসকারী এনজাইম দিয়ে সকল ডিএনএ ধ্বংস করে ফেললেন। এবং তাতে রোগ সেরে গেল। এতে প্রমাণ হয়ে গেল যে, জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যাদি ডিএনএর ভিতরেই ছিল, যে কারণে ডিএনএ ধ্বংসের সাথে সাথে অমসৃণ থেকে মসৃণ কোষে রূপান্তর বন্ধ হয়ে গেছে। অন্যভাবে বললে, জীন আছে ডিএনএর ভিতরেই।

তবে কেন যেন এত গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারের পরেও এই তিন বিজ্ঞানীর কেউ নোবেল পুরস্কার পাননি। ব্যাপারটা একটু অবাক হওয়ার মতোই!


ডিএনএতেই জীনের অবস্থান - আরো এক প্রমাণ


কোন ঘটনা যদি সত্য হয় তাহলে তা নিয়ে যত পরীক্ষা করাই হোক না কেন, ফলাফল হবে সেই একই, তাই না? তবে আগের ভুল ধারণা মুছে দিতে হলে কেবল একটা পরীক্ষায় পাশ করলেই হয় না, বরং নানান ধরনের পরীক্ষায় পাশ করতে হয়, এত সত্য প্রতিষ্ঠিত হয় জোরালো ভাবে। জীন থাকে প্রোটিনের ভিতর - অনেক দিনের এ ধারণা মুছে দিতে হার্শেচেস এক পরীক্ষা করেছিলেন। এ পরীক্ষায় তারা ব্যবহার করেছিলেন ভাইরাস ও ব্যাক্টেরিয়া। কিছু ভাইরাস আছে যারা ব্যাক্টেরিয়াকে আক্রমণ করে, এদেরকে বলে ব্যাক্টেরিওফেজ বা সংক্ষেপে ফেজ। ফেজগুলো ব্যাক্টেরিয়াকে আক্রমণ করে এর ভিতর ঢুকে বংশবৃদ্ধি করে। ফেজ ভাইরাসের গঠন সহজভাবে বুঝাতে চাইলে বলতে হয়, এর খোলস অংশ (মাথা, কলার ও লেজের বাইরের অংশ) প্রোটিন দিয়ে তৈরি, আর মাথার ভিতরে থাকে ডিএনএ, নিচের ছবির মতো।

চিত্র ২: ব্যাক্টেরিওফেজের গঠন

হার্শে আর চেস করলেন কি, কিছু ফেজ ভাইরাসের প্রোটিনসহ খোলসকে তেজস্ক্রিয় সালফার (35S) দিয়ে চিহ্নিত করে দিলেন, যাতে প্রোটিনের চলাফেরা/গতিপথ ভালভাবে পর্যবেক্ষণ করা যায়। একইভাবে কিছু ভাইরাসের ডিএনএকে তেজস্ক্রিয় ফসফরাস (32P) দিয়ে চিহ্নিত করে দিলেন। এরপর দেখতে লাগলেন ফেজগুলোর আক্রমণ প্রক্রিয়া।
চিত্র ৩: হার্শে ও চেসের পরীক্ষা

তারা দেখলেন যে, ফেজগুলো ব্যাকটেরিয়াকে আক্রমণের সময় ফেজের খোলস (প্রোটিন) অংশ ব্যাকটেরিয়ার ভিতরে ঢুকেনি, কিন্তু ডিএনএ অংশ ভিতরে ঢুকেছে। এরপর দ্রতগতিতে নাড়িয়ে মিশ্রণ তৈরি করলেন যেন ব্যাক্টেরিয়ার গায়ের বাইরের দিকে লেগে থাকা খোলসগুলো গা থেকে খসে যায় এবং শেষমেশ খসে যাওয়া খোলস আলাদা করে ফেললেন। এতে বাইরের প্রোটিন আলাদা হয়ে গেল ঠিকই, কিন্তু ব্যাক্টেরিয়ার ভিতরে ঢুকে যাওয়া ফেজের ডিএনএ ব্যাক্টেরিয়ার ভিতরেই রয়ে গেল। কিন্তু এরপরেও দেখা গেল যে, ফেজ ভাইরাসের বংশবৃদ্ধি ঠিকমতোই হচ্ছে। অর্থাৎ, প্রোটিন না থাকার পরেও কেবল ডিএনএ থাকার ফলেই বংশবৃদ্ধি হচ্ছে। তার মানে, বংশগতির বৈশিষ্ট্যগুলো প্রোটিন নয়, বরং ডিএনএতেই ছিলো; না হলে তো আর বংশবৃদ্ধি ঘটতো না।

এসব মজার মজার বুদ্ধিদীপ্ত গবেষণাগুলোর কারণেই জীবনের গল্প আজ এত সমৃদ্ধ! তবে, গল্পের কাহিনী যে আরো কিছু বাকি রয়ে গেল, সে কারণে দুঃখিত।

রেফারেন্স:
১) Neil C. Jones and Pavel A. Pevzner, Introduction to Bioinformatics Algorithms
২) Stuart M. Brown, Essentials of Medical Genomics

Tuesday, July 31, 2012

উদ্দেশ্যহীন জীবন, দ্বিধান্বিত মন

কেউ আমাকে একটু কষ্ট করে বোঝাবেন, জীবনের উদ্দেশ্য কি? সত্যি বলছি, এই ব্যাপারে বিশেষ অজ্ঞ আমি। বিশেষ সন্দিহান। ছোটবেলায় না হয় শুনেছিলাম - স্বর্গ-নরক আছে, স্বর্গে যেতে হলে তাই ভাল কাজ করতে হবে। ধর্মের কথা থাক। ধর্ম যখন ছেড়েছি, তখন না হয় স্বর্গ-নরকের কথাও বাদ দিলাম। কিন্তু ছোটবেলার আরেকটা শিক্ষার কথা এখনো ছাড়তে পারিনি। কেন পারিনি তাও জানিনা। কিছু জিনিসকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা পেতে কি? জানি না। তবে কথাটা মনে মনে মানি - "মানুষ বাঁচে কর্মের মধ্যে, বয়সের মধ্যে নয়"। কিন্তু যখনই এ কথার গ্রহণযোগ্যতা যাচাই করতে যাই, বেয়াড়া মন তখন বলে, জীবনেরইতো কোন অর্থ নেই, আর দশটা প্রাণীর মতো আমিও একদিন মরে যাবো। বিজ্ঞান বলে, আমারতো নয়ই, বিশেষত্ব নেই কারো মাঝেই। এ অবস্থায় "কর্মের মধ্যে বাঁচা"-র মতো দার্শনিক অবস্থানের গুরুত্ব কোথায়? আমরা কি নিজেরা বেঁচে থাকার অর্থ বের করার জন্য শুধু-শুধুই কিছু অর্থহীন অর্থ দাঁড় করাচ্ছি না?

তবে একটা সত্য ক্ষণে-ক্ষণে উপলব্ধি করি, মহৎ কাজ করলে অন্যের সম্মান পাওয়া যায়, সম্মান পেতে ভাল লাগে। ভাল কাজ করলে অন্যের বাহবা পাওয়া যায়, বাহবা পেতে ভাল লাগে। আমি চাই অন্য কেউ আমার কাজের প্রশংসা করুক, প্রশংসা পেতে ভাল লাগে। ভাল লাগে অন্যরা আমার কাজের প্রতি সমর্থন জানালে; ভাল লাগে আমার প্রতি, আমার কাজের প্রতি অন্যদের আকর্ষণ দেখলে।

এই ভাল-লাগা-গুলোর মাঝে কেমন যেন একটা শো-অফ টেন্ডেন্সি আছে, তাই না? নিজে যা করি, তা অন্যদের দেখানোর ব্যাপার আছে, তাই না? এই "শো-অফ" জিনিসটাকে আবার বিশেষ অপছন্দ। তাই নিজেকে সেই শো-অফের তালিকায় দেখলে খারাপ লাগে। চোখের সামনে দেখতে পাই - প্রায় প্রতিটা মানুষ নিজেকে বিজ্ঞাপন বানিয়ে প্রচার করছে। এক শিক্ষককে যেকোন কথার শুরুতেই তাই বলতে শুনি - "When I was in Japan, ..."। মেইলের শেষে তাই দেখতে পাই - "Sent from my iPhone"। কিংবা কারো সাথে গল্প করতে গেলেই শুনতে পাই - "আমার বেলায় কি হয়েছে জানো ..."। মুক্তমনাতেও দেখতে পাই - "এ নিয়ে আমিও একটা লেখা লিখেছিলাম, এই যে লিংক ..."। আমি নিশ্চিত এ ধরনের শো-অফকে অপছন্দ করেন সবাই, বিশেষ করে অন্যের বেলায় হলেতো অবশ্যই। সমস্যা কেবল নিজের বেলায় এ তত্ত্ব প্রয়োগের ব্যাপারে। সকলেই বলবেন, "আমিতো করিনা।" নিজেকে এ সমস্যার বাইরের কেউ বলে দাবি করছি না, তবে অন্যদের এ ধরনের আচরণ দেখে মনে মনে ঠিকই হাসি। :) আর নিজের জন্য মনে মনে একটা স্ট্যান্ডার্ড ঠিক করি - "আমি আমার কাজ করে যাই, এতে যদি কেউ ভাল বলে তো বলুক, প্রশংসা করে তো করুক, সেদিকে মাথা না ঘামাই।"

কিন্তু স্ট্যান্ডার্ড দিয়ে কী হয়, বলুন। না হয় নিজের কোন বিজ্ঞাপন প্রচার করলাম না, কিন্তু আমিতো ঠিকই জানি, একটুখানি সম্মানের জন্য কীরকম মুখিয়ে থাকে মন! একটুখানি প্রশংসা কীরকম উৎসাহিত করতে পারে আমায়! আচ্ছা, এই কারণে কি আমাকে ভন্ড বলা যেতে পারে? সততার সাথে বলি - আমার মনে হয় আমাকে ভন্ড বলা যেতেই পারে। এরপর মন ফিরে যায় আগের জায়গায়, এবার দেয় ভিন্ন যুক্তি - কর্মের মধ্যে বেঁচে থাকার মানে কি? পরবর্তীতে কেউ সম্মানের সাথে বলবে, 'অমুকে' তমুক কাজ করছিলো - এইতো? তাহলে আমি যদি সেইভাবে বাঁচতে চাই, আমি যদি আমার কাজের জন্য অন্যের কাছ থেকে প্রশংসা প্রত্যাশা করি, তাহলে আমাকে ভন্ড বলা হবে কেন? একটু পরেই যুক্তি-তর্ককে বিদায় করে দেয় মন। তার কাছে একটা প্রবোধ তৈরিই থাকে - "হলাম না হয় ভন্ড, এরকম ভন্ড সবাই, কেউ স্বীকার করে, কেউ করে না।"

আচ্ছা, ভন্ড হলেই বা ক্ষতি কি? জীবনের কি কোন অর্থ আছে? কোন উদ্দেশ্য আছে? মনের মধ্যে বাজতে থাকে "Shall We Dance?" সিনেমার "মানুষ কেন বিয়ে করে?" প্রশ্নটার উত্তর, যার মধ্যে জীবনের উদ্দেশ্য নিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু সত্য আছে কিনা তাই ভাবি -


Because we need a witness to our lives. There's a billion of people on the planet. What does any one life really mean? But in a marriage, you are promising to care about everything - the good things, the bad things, the terrible things, the mundane things... all of it, all the time, every day. You're saying "Your life will not go unnoticed, because I'll notice it. Your life will not go unwitnessed, because I'll be your witness."